ভ্রমি কসোভো বিস্ময়ে

‘কসোভো’, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জাতিগত সংঘাতের দেশ বলে পরিচিত। সেখানে আরও রয়েছে রোদে চকচক করা পাহাড়ি রাস্তার ধুলোমাখা গন্ধ কিংবা সাইকেলের প্যাডেলে ভর দিয়ে ওঠা এক নিঃশ্বাসের কষ্টে লুকিয়ে থাকা আনন্দ…
—————————————————

প্রথম দিনের বিস্ময়, রাজধানী প্রিস্টিনার সকালটা ছিল অচেনা; তবে মৃদু শীতলতায় ভরা। ঢাকার কোলাহলে অভ্যস্ত হয়ে পড়া আমাদের প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও দ্রুতই মানিয়ে নিলাম। রাস্তার দুই পাশে ক্যাফে। এত সকালে খোলেনি। আমরা এক বেকারি থেকে খাবার কিনে আরেকটু দূরের ক্যাফেতে গিয়ে প্রথম দিনের প্রাতঃরাশ সারলাম। এখানকার অর্ধেক মানুষই ত্রিশের নিচে–তাদের চোখে নতুন দেশ গড়ার উচ্ছ্বাস। আমরা যখন উত্তরের পথে সাইকেলে উঠলাম, শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল; বদলে এলো পাহাড়ি ঢাল আর নদীর চকচকে জলে সূর্যের ঝিলিক।
মিত্রোভিচা পৌঁছে বুঝলাম, খবরের কাগজে যে শহরটিকে ‘বিভক্ত’ বলা হয়, সেখানে বিভাজনের চেয়ে বড় কিছু আছে মানুষের আন্তরিকতা। বিভক্ত বলার কারণ হলো, এ শহরের উত্তরে খুবই কাছে সার্বিয়া আর কসোভো একসময় সেই দেশটির অংশ ছিল। এ শহরের অধিবাসীদের মধ্যে সেই বিভক্তি এখনও কাজ করে। হোটেলের কর্মচারীরা সাইকেল রাখার জায়গা খুঁজে দেন, রেস্টুরেন্টের মালিক দাম কমিয়ে দিতে চাযন। সার্ব আর আলবেনীয়–দুই দলের মানুষের মধ্যেও এক অদ্ভুত সহাবস্থান। হয়তো ইতিহাসে ক্ষত রয়ে গেছে। মানুষ বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছে নিজের মতো করেই।

ক্লিনা: এক অপরিচিত মেয়ের দিশা
পরদিন দুপুরে পৌঁছালাম ক্লিনায়। রোদ চড়া, রাস্তার পাশে বিক্রি হচ্ছে তাজা ফল, মধু আর পাহাড়ি সবজি। চারদিকে একরাশ প্রাণচাঞ্চল্য। ছোট-বড় নানা রকমের ক্যাফে। এখানে ক্যাফে বেশ জনপ্রিয়। মাঝদুপুরে হল্লায় মশগুল শহর। আমরাও ভাবলাম, এখানে থাকলে ক্ষতি কী! কিন্তু না! হোটেল খুঁজে হতাশ হলাম, পুরো শহরে থাকার জায়গা নেই। কসোভো দেশ হিসেবে যেহেতু বেশ ছোট এবং গাড়িনির্ভর, তাই স্বল্প দূরত্বের শহরগুলোয় থাকার জায়গা সবসময় মেলে না। এখানেও তাই হলো। এমন সময় যখন আমরা কী করব, না করব ভেবে স্থির হতে পারছি না, ঠিক তখনই এক তরুণী হাসিমুখে এগিয়ে এলো। ‘আপনারা পথ হারিয়েছেন?’ বলল ইংরেজি উচ্চারণে। আমাদের সমস্যাটা শুনে সে নিজের ব্যাগ নামিয়ে সঙ্গে হাঁটল কয়েক কিলোমিটার, জটলা ছাড়িয়ে দেখিয়ে দিল কতদূর এগোলেই শহরের বাইরে হোটেলটা পাওয়া যাবে। একটাই মাত্র হোটেল। ‘সেফ রাইড!’ বলেই ফিরে গেল নিজের কাজে। সেই অচেনা মেয়ের হাসিটা যেন পুরো যাত্রার প্রতীক। অচেনাও কেমন করে আপন হয়ে যায়, তা কেবল পথেই বোঝা যায়।

পেজা: ইতিহাসের শহর, সকালের হাওয়া
পেজার পথে ওঠার সময় ভোরের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগে কাঁটার মতো। আবার সেই হাওয়া যেন নতুন উদ্যমও দেয়। রাস্তার পাশে পাহাড়ের গায়ে গাঘেঁষে দাঁড়িয়ে পুরোনো কারখানা–তার বড় বড় দেয়ালে লেখা ‘PEJA’। এখানকার জনপ্রিয় কোমল পানীয়ের নাম। শহরে ঢুকতেই ভিড় থাকলেও ট্রাফিক শান্ত। সাইকেলে করে ধীরে ধীরে এগোতে গিয়েও কোনো হর্ন, কোনো রাগ নেই এক অদ্ভুত সহিষ্ণুতা।
হোটেলে ব্যাগ রেখে আমরা বের হলাম পুরোনো বাজারে। কাঠের দোতলা দোকান, পাথরের রাস্তা আর কফির গন্ধে ভরা বাতাস। এক তরুণ গাইড আমাদের নিয়ে গেল পেজার জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে। অটোমান যুগের কাঠের বাড়িতে সাজানো স্থানীয় পোশাক, গহনা, হুক্কা, কফির পাত্র। গাইড বলল, ‘পেজা বদলায়নি এক দিনে; এখানে সময় স্তরে স্তরে জমে থাকে।’ তার সেই কথা যেন শহরের নিজস্ব ছন্দ শান্ত, তবু প্রাণময়।

প্রিজরেন: নদী, সেতু, ইতিহাসের আলো
পরদিনের গন্তব্য ৮০ কিলোমিটার দূরের প্রিজরেন। সকাল ৭টার দিকে রওনা দিলাম। কসোভোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর–বলতেই হয়, এটি অন্যতম আকর্ষণও বটে। তুর্কিদের গড়া এ শহরের ছবি আগেই দেখেছিলাম। এক পাহাড় পেরিয়ে আরেক ঢালে নামতে নামতে দেখি কুয়াশা ভাঙছে, সূর্য ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে নদীর ওপরে। রাস্তার পাশে ছোট ক্যাফে, ভেতরে ঘুমচোখে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ। আমরা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘Come in, coffee!’ সেই এক কাপ কফিই দিনজুড়ে রাখল উষ্ণতা।
মাঝদুপুরের ঠাঠা রোদে আমরা প্রিজরেনে পৌঁছলাম। রোদ কমলে মূল শহরের দিকে ঢুকতেই মনে হলো, সময় যেন পেছনে ফিরে গেল। নদীর ওপর প্রাচীন পাথরের সেতু, পাশে সিনান পাশা মসজিদ, ওপরে পাহাড়ের কোলে পুরোনো দুর্গ। বিকেলের সোনালি আলোয় শহরটা ছবির মতো লাগে। আমরা বসে রইলাম নদীর ধারে, মানুষের হাসি আর মোলায়েম বাতাসে হারিয়ে যেতে যেতে বুঝলাম ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ে নয়, এই রাস্তাগুলোর মধ্যেও বেঁচে আছে।

প্রেভালা: পাহাড়ের সঙ্গে লড়াই
পঞ্চম দিনের সকাল, সামনে সবচেয়ে কঠিন পর্ব প্রিজরেন থেকে প্রেভালা। ১২০০ মিটার ওপরে উঠতে হবে ২৮ কিলোমিটার। রাস্তা শুরু হতেই ঢাল বাড়তে লাগল। পাহাড়ি পথে জোরে সাইকেল চালানোর অবস্থা নেই এমনিতেই। তার ওপর কিছু দূর পরেই দেখা দিল বিপদ–একদল কুকুর রাস্তার পাশে। মাঝেমধ্যেই আমাদের দিকে তাকাচ্ছে, এক ধরনের চাপা ভয়। এত কাছে–তার ওপর আমরা ধীরগতিতে চলছি। হঠাৎ এক গাড়ি এলো, কুকুরগুলো সেটির পিছু নিল। এই দেখে ভয়ে আমরা নেমে গেলাম। আমাদের সঙ্গেও যদি একই ঘটনা ঘটে তবে সমস্যা। অদূরে অপেক্ষায় থাকলাম কোনো গাড়ির জন্য। একটু পরেই এক ট্রাকচালক থামল, আমাদের অবস্থা বুঝে হাসতে হাসতে ট্রাকে তুলে নিল। ঠান্ডা বাতাসে আমরা কাঁপছিলাম। তারপরও মনে হচ্ছিল–মানুষের মমতা পাহাড়ের চেয়ে বড়।

কাচানিক: ইতিহাসের স্তর
প্রেভালা থেকে নামার সময় ঠান্ডা বাতাসে আঙুল জমে যাচ্ছিল। ব্রেক কষে কষে পাহাড় পেরিয়ে নেমে এলাম কাচানিক ই ভিয়েতার–ছোট্ট শহর, তবু মুখে ইতিহাস। রাস্তার পাশে সার্বীয় চার্চ, ওপারে আলবেনীয় পতাকা। দোকানের সাইনবোর্ডে দুই ভাষা পাশাপাশি। তবুও মানুষের আচরণে কোনো তিক্ততা নেই। যেন ইতিহাসের ক্ষতগুলো সময়ের ধুলোয় ঢেকে গেছে। সন্ধ্যায় হোটেল ইউরোপা ৯২-এ গ্রিল আর কফি খেতে খেতে মনে হলো, ভৌগোলিকভাবে যত বিভক্তই হোক, আতিথেয়তায় বলকান একদম এক।
কসোভো আমাকে শিখিয়েছে, পৃথিবীর মানচিত্র নয়, মানুষই এক দেশকে সংজ্ঞা দেয়। পাহাড় শেখায় ধৈর্য, নদী শেখায় চলতে থাকা আর মানুষ শেখায়–অচেনাও হতে পারে নিজের মতো ঘনিষ্ঠ।

Leave a Reply